ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আর কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না’। ট্রাম্প যখন ওয়াশিংটনের শক্তি প্রদর্শনে মনোযোগী, একই সময়ে চীন ও রাশিয়াও নিজ নিজ প্রভাববলয় সুসংহত ও সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন শক্তির কৌশল মিলিয়ে একটি নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব ইউরোপসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ওপরও পড়বে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নতুনভাবে সাজাচ্ছে—যেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে পশ্চিম গোলার্ধ। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়নে অভিবাসন, অপরাধ ও মাদক পাচারের মতো ইস্যুকে সামনে আনা হয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের ভাষায়, বর্তমান বিশ্ব ‘শক্তি ও ক্ষমতা দ্বারা শাসিত’। অনেকের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে হেনরি কিসিঞ্জার–রিচার্ড নিক্সনের বাস্তববাদী নীতির স্মৃতি জাগায়, অন্যদিকে বিংশ শতকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি ও থিওডোর রুজভেল্টের প্রভাববলয়ভিত্তিক কৌশলের সঙ্গেও সাদৃশ্য রাখে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের আগ্রহ স্পষ্ট—ভেনেজুয়েলা অভিযান, ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ, এমনকি পানামা খাল, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল বলছে, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। একই সঙ্গে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকানোও এ কৌশলের অংশ।
অন্যদিকে চীনের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা—সবখানেই বেইজিংয়ের উপস্থিতি বাড়ছে। উৎপাদনশীলতা ও বাণিজ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীন বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পণ্য তৈরি হয় চীনে। বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণও তাদের নিয়ন্ত্রণে, যা প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘চীনা জাতির মহা পুনর্জাগরণ’-এর স্বপ্নে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে অবকাঠামো ও ঋণনির্ভর সম্পর্ক গড়ে তুলছেন।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ‘নিকট প্রতিবেশ’ ধারণাই মূল। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ‘বিশ শতকের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলেছিলেন। তার দৃষ্টিতে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোতে রাশিয়ার বিশেষ স্বার্থ রয়েছে। ইউক্রেন ও জর্জিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ, ক্রিমিয়া দখল এবং দীর্ঘমেয়াদি চাপ প্রয়োগ—সবই এই কৌশলের অংশ। মস্কো দাবি করে সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, তবে বাস্তবে প্রভাববলয় ছাড়তে চাইলে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর নজির রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—তিন পরাশক্তিই নিজেদের শক্তি, অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা দিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকেই এগোচ্ছে। সমঅধিকারভিত্তিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর বদলে প্রভাববলয়ভিত্তিক রাজনীতির এই পুনরুত্থান বিশ্বকে অতীতের আরও অস্থির সময়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো।
মন্তব্য করুন: