[email protected] সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
২৯ পৌষ ১৪৩২

শক্তির নতুন বিশ্বব্যবস্থার অন্ধকার অধ্যায়

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:০১ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি। শনিবার। রাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিট। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস তখন গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। রাষ্ট্রপতির বাসভবন মিরাফ্লোরেস প্যালেসের চারপাশে এলিট গার্ডদের নিয়মিত টহল, আকাশে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই, সবকিছু ছিল স্বাভাবিক।

ঠিক তখনই আকাশ চিরে ভেসে আসে এক ভিন্ন শব্দ।
এটি কোনো সাধারণ হেলিকপ্টারের নয়।
এটি ছিল যুদ্ধের শব্দ।

মুহূর্তের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্ধ হয়ে যায়।
রাশিয়ান প্রযুক্তিতে তৈরি রাডার ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মার্কিন স্টেলথ প্রযুক্তির সামনে কোনো সতর্কতাই দিতে পারেনি।

এই অভিযানের কোড নেম ছিল, অপারেশন অবসলিউট রিজলভ।

লক্ষ্য কোনো সামরিক ঘাঁটি নয়, কোনো অস্ত্রাগার নয়।
লক্ষ্য ছিল সরাসরি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট, Nicolás Maduro।

মার্কিন বিশেষ বাহিনী দড়ি বেয়ে নামতে থাকে প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেসের ছাদ থেকে।
কোনো গুলির শব্দ নেই।
কোনো সতর্কবার্তা নেই।

মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস তখন ঘুমন্ত অবস্থায়।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের কক্ষ ঘিরে ফেলা হয়।
কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়েই তাদের টেনে বের করে আনা হয়।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড বাহিনী বুঝে ওঠার আগেই পুরো এলাকা মার্কিন নিয়ন্ত্রণে।

কয়েক মিনিট পর, চোখ বাঁধা অবস্থায় মাদুরোকে তোলা হয় একটি সামরিক হেলিকপ্টারে।
গন্তব্য, সমুদ্রে অপেক্ষমান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ।

এই দৃশ্যটি ছিল ল্যাটিন আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন মুহূর্ত।
একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজের শোবার ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত।

পরদিন ভোরে সেই ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
একসময়ের দাপুটে সমাজতান্ত্রিক নেতা, জাহাজের ডেকে বন্দি।

 

রাষ্ট্রপ্রধান থেকে আসামি

২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মাদুরোকে আনা হয় যুক্তরাষ্ট্রে।
নিউইয়র্কের একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণের পর কড়া পাহারায় তাকে নেওয়া হয় ম্যানহাটনের ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে।

৫ জানুয়ারি।
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ান মাদুরো।

এই কক্ষেই ঘটে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রতীকী পতন।

নেই কনো সুট।
নেই কনো রাষ্ট্রপতির ব্যাজ ।
তখন তার গায়ে শুধু একটি নীল রঙের পোশাক, যা বন্দিদের পরানো হয়।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগপত্র ছিল বহু বছরের প্রস্তুতির ফল।
তারা দাবি করেন, মাদুরো দুই দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ফার্কের সঙ্গে জোট বেঁধে যুক্তরাষ্ট্রে টন টন কোকেন পাচার করেছেন।

এই অবৈধ অর্থ দিয়েই তিনি ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছিলেন, এমনটাই যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।

কিন্তু এখানেই মাদুরো চাল দেন এক অপ্রত্যাশিত আইনি চাল।

তিনি নিজেকে ঘোষণা করেন যুদ্ধবন্দী।

তার আইনজীবীরা যুক্তি দেন,
যেহেতু একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতরে মার্কিন সামরিক অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়েছে, তাই তিনি ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের আওতায় বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার।

এই যুক্তির পেছনে ছিল বড় কৌশল।
যুদ্ধবন্দী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে তার বিচার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত থেকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে চলে যেতে পারত।

কিন্তু বিচারক কোনো দ্বিধা রাখেননি।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
মাদুরো কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আটক হননি।
তিনি একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী।

সবচেয়ে করুণ মুহূর্ত আসে তখন, যখন মাদুরো নিজেকে “ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট” হিসেবে পরিচয় দিতে চাইলে বিচারক তাকে থামিয়ে দেন।

তাকে বলা হয়,
এই আদালতে তিনি কেবল মিস্টার মাদুরো

এই একটি বাক্যই ছিল তার রাজনৈতিক অস্তিত্বের চূড়ান্ত অবসান।

 

বিশ্ব প্রতিক্রিয়া

এই অপহরণ বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
ডেনমার্ক, মেক্সিকোসহ একাধিক দেশ এটিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানায়।

তাদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট,
এভাবে যদি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যায়, তবে সার্বভৌমত্বের ধারণা অর্থহীন হয়ে পড়বে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন বার্তা দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এক ঘোষণায় জানান,
ভেনেজুয়েলার তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল এখন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকবে।

এটি কোনো কূটনৈতিক বক্তব্য ছিল না।
এটি ছিল শক্তির ভাষায় লেখা নীতি।

 

পুতিনের নীরবতা

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়, রাশিয়ার নীরবতা।

মাদুরো ছিলেন মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র।
রাশিয়ার অস্ত্র, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা চুক্তি, রাশিয়ার রাজনৈতিক সমর্থন, সবই ছিল।

তবুও এই সংকটে ক্রেমলিন থেকে কোনো দৃঢ় প্রতিক্রিয়া আসেনি।

বরং রাশিয়ার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র।
এক পাশে Vladimir Putin-এর পুরোনো উক্তি
WE DON’T GIVE UP ON OUR OWN
“আমরা আমাদের লোকদের কখনো ছেড়ে দিই না।”

আর তার পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো,
Muammar Gaddafi
Viktor Yanukovych
Bashar al-Assad


এবং সবশেষে, নিকোলাস মাদুরো।

কেন এই নীরবতা?

বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ।
চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ব্যস্ত।

এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা মস্কোর জন্য আত্মঘাতী হতে পারত।

দ্বিতীয় কারণ আরও গভীর।

ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে একটি নীরব সমঝোতা হয়েছে।
ইউক্রেন ইস্যুতে কিছু ছাড়ের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আধিপত্য মেনে নেওয়া হয়েছে।

এই সমঝোতার কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি রাজনীতি।
রাশিয়ার নতুন তেলক্ষেত্র উন্নয়নে মার্কিন প্রযুক্তির প্রয়োজন, এই বাস্তবতা পুতিনকে আপসের পথে ঠেলে দিতে পারে।

 

নতুন বিশ্বব্যবস্থা, আইন নয়, শক্তি

এই ঘটনায় একটি বিষয় পরিষ্কার,
আন্তর্জাতিক আইন আর শেষ কথা নয়।

১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
লাতিন আমেরিকা হবে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবক্ষেত্র।

আর রাশিয়ার নীরবতা এই ব্যবস্থাকে নীরব সম্মতি দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে
সার্বভৌমত্ব নয়, শক্তিই শেষ কথা।

 

নিকোলাস মাদুরো এখন একজন বন্দি।
ভেনেজুয়েলার তেল এখন অন্যের নিয়ন্ত্রণে।
আর রাশিয়া শুধু বসে বসে দেখছে।

বোঝানো হচ্ছে এই নীরবতা কোনো দুর্বলতা নয়।
এটি হিসাবের নীরবতা, যা পরে মিলিয়ে নেওয়া হবে।

কিন্তু ইতিহাস বলে,
শক্তির এই হিসাব খুব সহজে মেলেনা।

এখন প্রশ্ন একটাই
এর পর কার পালা?

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর